
নতুন একটি স্মার্টফোন কেনার বাজেট অনেকেরই থাকে না,আবার অনেকে অল্প খরচে প্রিমিয়াম সব অভিজ্ঞতা পেতে চান। আর এই দুই চাহিদা মেটানোর সবচেয়ে জনপ্রিয় উপায় হলো সেকেন্ড হ্যান্ড বা পুরনো ফোন কেনা।
তবে নতুন ফোন কেনার চেয়ে ব্যবহৃত ফোন কেনা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। একটু অসাবধান হলেই নষ্ট,চুরি যাওয়া কিংবা রিফার্বিশড ফোন কিনে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।তবে সামান্য কিছু সাবধানতা অবলম্বন করলেই এর থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব।
আপনি যদি সঠিক কৌশল এবং সতর্কতার সাথে ব্যবহৃত ফোন যাচাই করতে পারেন, তবে অনেক কম খরচে বাজারের সেরা ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইসটিও নিজের করে নিতে পারেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো,দোকানদার বা বিক্রেতার হাজারো সুন্দর কথার ভিড়ে কীভাবে বুঝবেন ফোনটি আসলেও ভালো ও পুরোনো স্মার্টফোন কেনার আগে যে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিখুঁতভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত,তার বিস্তারিত নির্দেশনা নিচে দেওয়া হলো।
১. বাজেট ও সঠিক মডেল নির্বাচন
ব্যবহার করা ফোন কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর প্রথম কাজই হলো নিজের চাহিদা ও বাজেট নির্ধারণ করা। নতুন ফোনের মতো সেকেন্ডহ্যান্ড ফোনে নির্দিষ্ট কোনো অফিসিয়াল দাম থাকে না।
অবস্থা,বয়স এবং মডেলের ওপর নির্ভর করে একেক বিক্রেতা একেক দাম চাইতে পারেন। তাই কেনার আগে নির্দিষ্ট মডেলের বর্তমান দাম এবং পুরনো অবস্থায় সেটির আনুমানিক দাম কত হতে পারে,সে সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা থাকা দরকার।
ফোনের মডেল নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্র্যান্ডের ওপর নজর দেওয়া খুব দরকার। বাজারে কিছু ব্র্যান্ডের ফোন দুই বা তিন বছর ব্যবহারের পরও খুব ভালো সার্ভিস দেয়,আবার কিছু ব্র্যান্ডের ফোন অল্প দিনেই স্লো হয়ে যায় বা ব্যাটারি পারফরম্যান্স হারায়।
তাই এমন মডেল বেছে নেওয়া উচিত যার ট্র্যাক রেকর্ড ভালো এবং সার্ভিস সেন্টার বা রিপেয়ারিং পার্টস সহজে পাওয়া যায়।অনলাইন মার্কেটপ্লেস বা ফেইসবুক গ্রুপগুলোতে খোঁজ নিয়ে আপনি জানতে পারবেন যে মডেলটি আপনি কিনতে চাচ্ছেন, সেটির ব্যবহৃত সংস্করণের বর্তমান দরদাম কেমন।
যদি দেখেন একজন বিক্রেতা বাজারদরের চেয়ে অনেক কম দামে ফোনটি বিক্রি করতে চাইছেন তবে শুরুতেই কিছুটা সন্দেহ থাকা ভালো। কারণ অতি সস্তা দামের আড়ালে গোপন কোনো বড় সমস্যা বা ফোনটি চুরি করা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে অনেক বেশি।
২.ফোনের বাহ্যিক অবস্থা ও বিল্ড কোয়ালিটি যাচাই
মোবাইল হাতে পাওয়ার পর প্রথমেই সেটির বাহ্যিক রূপ খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। ফোনটির গায়ে বা ফ্রেমের কোথাও বড় ধরনের কোনো দাগ,ডেন্ট বা ফাটল আছে কি না তা দেখা অত্যন্ত প্রয়োজন। সামান্য স্ক্র্যাচ থাকা স্বাভাবিক,কারণ এটি ব্যবহৃত ফোন। কিন্তু ফ্রেমে গভীর কোনো দাগ থাকার মানে ফোনটি পূর্বে কোনো শক্ত জায়গায় আছাড় খেয়েছিল।
মোবাইলের চারপাশের বডি বা ডিসপ্লের বর্ডার জয়েন্টগুলো নিখুঁত আছে কি না দেখে নিন। যদি ব্যাক প্যানেল বা ডিসপ্লের চারপাশ থেকে গ্লু বা আঠা বের হয়ে থাকতে দেখা যায়,তবে বুঝে নিতে হবে ফোনটি আগে খোলা হয়েছিল বা রিপেয়ার করা হয়েছে। অনেক সময় ফোন খোলার পর লোকাল মেকানিক দিয়ে আঠা দিয়ে লাগানো হয়,যা চোখে দেখে সহজেই ধরে ফেলা যায়।
ক্যামেরার লেন্সের গ্লাসটি পরিষ্কার আছে কি না এবং ভেতরে কোনো ধুলাবালি ঢুকেছে কি না তা ভালো আলোতে পরীক্ষা করে নিন। ক্যামেরার গ্লাসে সামান্য ফাটল থাকলেও পরবর্তীতে ছবি ঘোলা আসবে এবং ধীরে ধীরে ক্যামেরার সেন্সরে ধুলা জমে বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। এছাড়া সিম ট্রেই,মেমোরি কার্ড স্লট এবং চার্জিং পোর্টটি স্বাভাবিক শক্ত আছে কি না,নাকি ঢিলেঢালা হয়ে গেছে—সেটিও হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে নিবেন।
৩.ডিসপ্লে এবং টাচ স্ক্রিনের আসল অবস্থা নিশ্চিত করা
স্মার্টফোনগুলোর সবচেয়ে দামী অংশ হলো এর ডিসপ্লে। বিশেষ করে অ্যামোলেড বা ওলেড ডিসপ্লেযুক্ত ফোনগুলোর ডিসপ্লে নষ্ট হলে তা পরিবর্তন করতে ফোনের মূল দামের প্রায় অর্ধেক খরচ হয়ে যায়। তাই সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন কেনার সময় ডিসপ্লে পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি সময় এবং মনোযোগ দেওয়া দরকার।
ডিসপ্লেটি আসল নাকি নকল বা চেঞ্জ করা,তা বোঝার কিছু সহজ উপায় আছে। নকল বা থার্ড পার্টি ডিসপ্লে লাগালে ফোনের ব্রাইটনেস মূল ডিসপ্লের মতো অত উজ্জ্বল হয় না এবং চারপাশের ব্যাজেল বা বর্ডার তুলনামূলক মোটা দেখায়।
ডিসপ্লেতে পুরোপুরি সাদা এবং পুরোপুরি কালো রঙের দুটি ছবি ফুলস্ক্রিন করে ওপেন করে দেখুন।সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে কোনো কালচে ছোপ,হলুদ দাগ বা‘ডিসপ্লে বার্ন’আছে কি না সহজেই ধরা পড়বে।অন্যদিকে কালো ব্যাকগ্রাউন্ডে দেখলে ডিসপ্লের কোথাও ব্রাইটনেস লিক বা সাদা দাগ আছে কি না দেখা যাবে।
টাচ স্ক্রিনের প্রতিটি অংশ সঠিকভাবে কাজ করছে কি না তা পরীক্ষার জন্য ফোনের যেকোনো একটি আইকন চেপে ধরে স্ক্রিনের প্রতিটা কোনায় এবং মাঝখানে টেনে ঘুরিয়ে আনুন।
যদি কোনো জায়গায় এসে আইকনটি হাত থেকে ছেড়ে যায়,তবে বুঝবেন স্ক্রিনের ওই অংশের টাচ রেসপন্স নষ্ট হয়ে গেছে। চাইলে গুগল প্লে স্টোর থেকে‘Touch Screen Test’ ধরনের ছোট কোনো অ্যাপ ইনস্টল করেও পুরো ডিসপ্লের রেসপন্স এক মিনিটে চেক করে নিবেন।
৪. ব্যাটারির স্বাস্থ্য ও চার্জিং পারফরম্যান্স
ব্যবহৃত ফোনের প্রধান সমস্যাগুলোর একটি হলো দুর্বল ব্যাটারি। ফোন যতই ভালো হোক না কেন,ব্যাটারির চার্জ যদি দ্রুত শেষ হয়ে যায় তবে সেই ফোন ব্যবহার করে কোনো মজা পাওয়া যাবে না। তাই কেনার আগে ব্যাটারি ব্যাকআপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
আইফোনের ক্ষেত্রে ফোনের সেটিংস থেকেই ‘Battery Health’ কত শতাংশ আছে তা সরাসরি দেখে নিতে পারেন। যদি হেলথ ৮০ শতাংশের নিচে নেমে যায়, তবে ধরে নিতে হবে খুব শীঘ্রই ব্যাটারি পরিবর্তন করতে হবে।
অ্যানড্রয়েড ফোনের ক্ষেত্রে সরাসরি সেটিংস থেকে ব্যাটারি হেলথ দেখার সুবিধা সব মডেলে থাকে না। সেক্ষেত্রে ডায়ালার প্যাডে নির্দিষ্ট ডায়াল কোড ব্যবহার করে অথবা ‘AccuBattery’ বা ‘Battery Info’ অ্যাপ ডাউনলোড করে ব্যাকগ্রাউন্ডে কিছুক্ষণ ব্যবহার করে ব্যাটারির রিয়েল-টাইম হেলথ সম্পর্কে জানতে পারবেন।
ব্যাটারি চার্জে দিয়ে পরীক্ষা করা অত্যন্ত কার্যকরী। সাথে একটি পাওয়ার ব্যাংক বা চার্জার রেখে অন্তত ১০ থেকে ১৫ মিনিট ফোনটি চার্জে দিয়ে রাখুন। চার্জিং পার্সেন্টেজ স্বাভাবিকভাবে বাড়ছে কি না দেখুন।
চার্জ দেওয়ার সময় ফোন অতিরিক্ত গরম হচ্ছে কি না বা ব্যাটারি পার্সেন্টেজ ৫ মিনিটেই লাফ দিয়ে ১০-১৫ শতাংশ বেড়ে যাচ্ছে কি না তা লক্ষ্য করুন। লাফিয়ে চার্জ বাড়া বা কমা হলো ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার স্পষ্ট লক্ষণ।
৫. আইএমইআই (IMEI) নম্বর ও সিকিউরিটি ভেরিফিকেশন
যে ফোনটি আপনি কিনতে যাচ্ছেন সেটি বৈধ নাকি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত বা চুরির ফোন,তা নিশ্চিত করা আপনার নিজের নিরাপত্তার জন্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চুরির বা অবৈধ ফোন কিনে পরবর্তীতে বড় ধরনের আইনি জটিলতায় পড়ার ইতিহাস অহরহ।
ফোনের ডায়াল প্যাড থেকে *#06# চাপলেই স্ক্রিনে ১৫ ডিজিটের আইএমইআই নম্বর দেখাবে। এবার ফোনের বক্সের সাথে থাকা আইএমইআই নম্বরের সাথে এটি মিলিয়ে দেখুন।
যদি বক্স না থাকে,তবে বিক্রেতার কাছ থেকে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) পরিষ্কার কপি এবং একটি লিখিত ক্যাশ মেমো গ্রহণ করুন। অ্যানড্রয়েড ফোনের ক্ষেত্রে BTRC-এর অফিসিয়াল মেসেজিং সার্ভিসের মাধ্যমে আইএমইআই নম্বর পাঠিয়ে সেটি সরকারি ডেটাবেজে নিবন্ধিত কি না জেনে নিতে পারেন।
ডিভাইসটিতে কোনো ধরনের অ্যাকাউন্ট লক ঝুলে আছে কি না তা ফোন কেনা শেষ করার আগেই নিশ্চিত করুন। যেমন আইফোনের ক্ষেত্রে ‘iCloud Lock’ বা ‘Find My iPhone’ অন আছে কি না দেখতে হবে। iCloud লক থাকা আইফোন কেনা আর ইট কেনা একই কথা।
অ্যানড্রয়েডের ক্ষেত্রে বিক্রেতাকে বলুন তার ‘Google Account’ বা ‘Factory Reset Protection (FRP)’ ফোন থেকে রিমুভ করে সম্পূর্ণ ফোনটি আপনার সামনেই ফ্যাক্টরি রিসেট দিতে। রিসেট দেওয়ার পর নতুন করে সেটআপ করে তবেই টাকা পরিশোধ করবেন।
৬.হার্ডওয়্যার,সেন্সর ও সাউন্ড সিস্টেম পরীক্ষা
স্মার্টফোনের ভেতরে বহু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সেন্সর এবং হার্ডওয়্যার মডিউল থাকে, যা ওপর থেকে দেখে বোঝার কোনো উপায় নেই। অথচ দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এই সেন্সরগুলো সচল থাকা খুবই দরকারি।
প্রতিটি ফোনে কিছু গোপন ডায়াগনস্টিক কোড থাকে,যা ডায়াল করে ফোনের ভেতরের সবকিছু একবারে পরীক্ষা করা যায়।
যেমন স্যামসাং ফোনের ক্ষেত্রে *#0*# ডায়াল করলে একটি সিক্রেট মেনু আসে,যেখান থেকে স্পিকার,ভাইব্রেটর,সেন্সর,রেড-গ্রিন-ব্লু কালার টেস্ট এবং টাচ স্ক্রিন এক ছাদের নিচে টেস্ট করা যায়। অন্যান্য ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রেও এমন নির্দিষ্ট কোড বা থার্ড পার্টি অ্যাপ রয়েছে।
ফোনের মাইক্রোফোন এবং ইয়ারপিস চেক করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো ফোনটি হাতে নিয়ে কাউকে একটি কল দেওয়া। অপর পাশের মানুষটি আপনার কথা স্পষ্ট শুনছেন কি না এবং আপনি তার কথা পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছেন কি না তা যাচাই করে নিন।
একই সাথে লাউডস্পিকার অন করে কোনো গান চালিয়ে দেখুন শব্দ ফেটে যাচ্ছে কি না বা আওয়াজ অতিরিক্ত কম কি না।প্রক্সিমিটি সেন্সর টেস্ট করার জন্য কল চলাকালীন হাত দিয়ে ফোনের ওপরের অংশ ঢেকে দিন। স্ক্রিনের আলো বন্ধ হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করুন।
আলো বন্ধ না হলে বুঝতে হবে প্রক্সিমিটি সেন্সর নষ্ট,যার ফলে কল করার সময় কানে ফোন লাগালে ভুলবশত স্ক্রিনে টাচ লেগে কল কেটে যেতে পারে বা মিউট হয়ে যেতে পারে। ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সর এবং ফেস আনলক কয়েকবার ফাস্ট কাজ করছে কি না সেটআপ করে পরীক্ষা করে নিন।
৭.ক্যামেরা সিস্টেমের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা
স্মার্টফোনের অন্যতম প্রধান ব্যবহার হলো ছবি ও ভিডিও তোলা। ক্যামেরা ঠিকমতো কাজ করছে কি না তা নিশ্চিত করতে ফোনের পেছনের প্রতিটি লেন্স এবং সামনের সেলফি ক্যামেরা আলাদাভাবে ওপেন করে দেখুন।
ছবি তোলার সময় মেইন লেন্স ছাড়াও আল্ট্রাওয়াইড, টেলিফোটো এবং ম্যাক্রো লেন্সে সুইচ করে দেখুন সেগুলো কাজ করছে কি না। অনেক সময় মেনু থেকে অন্য লেন্স চুজ করলে অ্যাপ ক্র্যাশ করে বা ছবি ব্লার আসে।
উজ্জ্বল আলোতে কোনো সাদা দেয়াল বা আকাশের দিকে ক্যামেরা ধরে ছবি তুলুন এবং ছবিটি জুম করে দেখুন কোনো কালো ফোঁটা বা ছায়া আছে কি না। ক্যামেরা সেন্সরে কোনো দাগ বা ধুলা থাকলে ছবিতে কালচে ছোপ স্পষ্ট দেখা যাবে।
ক্যামেরার অটোফোকাস দ্রুত কাজ করছে কি না দেখতে ক্যামেরাটি কোনো কাছের বস্তুর সামনে এবং সাথে সাথে কোনো দূরের বস্তুর সামনে ধরে দেখুন।
যদি ফোকাস ঠিকমতো না হয়, তবে লেন্সের অটোফোকাস মোটরে সমস্যা থাকতে পারে। এছাড়া ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে দুই-তিনটি ছবি তুলে দেখুন এবং ফোর-কে বা ফুল এইচডি ভিডিও রিকোর্ডিং অন করে ১০-১৫ সেকেন্ড ভিডিও করে সাউন্ডসহ প্লে করে শুনুন।
৮.প্রসেসর পারফরম্যান্স, ওভারহিটিং ও মেমোরি চেক
ব্যবহৃত ফোন দীর্ঘদিন চলার কারণে প্রসেসর বা মাদারবোর্ডে অতিরিক্ত তাপজনিত সমস্যা তৈরি হতে পারে। অনেক ফোন স্বাভাবিক অবস্থায় ঠিক থাকলেও ১০-১৫ মিনিট ভারী কাজ বা গেম খেললে মাত্রাতিরিক্ত গরম হয়ে যায় এবং হ্যাং করতে শুরু করে।
ফোনটির স্টোরেজ ও র্যাম টেস্ট করতে সেটিংস থেকে ‘About Phone’ অপশনে গিয়ে স্টোরেজ সাইজ মিলিয়ে নিন। অনেক সময় চায়নিজ ক্লোন বা কাস্টম রম দেওয়া ফোনে ভুয়া র্যাম-রোম শো করায়।
তাই অরিজিনাল অন্টুটু (AnTuTu) বা জিডিপিইউ-জিক (CPU-Z) অ্যাপ প্লে স্টোর থেকে নামিয়ে ফোনের মূল প্রসেসর,র্যাম এবং ইন্টারনাল স্টোরেজ আসল কি না নিশ্চিত হওয়া যায়।
সবকিছু ঠিক মনে হলে ফোনের ক্যামেরায় ৪-কে বা ১০৮০-পি মোডে একটানা ৫ থেকে ৭ মিনিটের একটি ভিডিও রেকর্ডিং অন করে রেখে দিন। ভিডিও রেকর্ডিং ফোনের প্রসেসর, গ্রাফিক্স এবং ব্যাটারির ওপর একবারে সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করে।
এই ৫ মিনিটের মধ্যে ফোন যদি স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত তেতে ওঠে বা ক্যামেরা অ্যাপ নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে ফোনটির মাদারবোর্ডে গরম হওয়ার বড় ধরনের যান্ত্রিক ত্রুটি রয়েছে।
৯.কানেক্টিভিটি ও নেটওয়ার্ক টেস্ট
একটি মোবাইল ফোনের মূল কাজ হলো নেটওয়ার্ক ধরে রাখা। কিন্তু অনেক হাতবদল হওয়া বা অতীতে সার্ভিসিং করানো ফোনে নেটওয়ার্ক আইসি দুর্বল হয়ে যায়,যার ফলে সিম ভরলেও বারবার নেটওয়ার্ক ড্রপ করে বা ডেটা স্পিড পাওয়া যায় না।
ফোনটি কেনার আগে আপনার নিজের নিয়মিত ব্যবহৃত সিম কার্ডটি সচল স্লটে ঢুকিয়ে দেখুন। ৪জি বা ৫জি নেটওয়ার্ক সিগন্যাল সব কটি বার ফুল দেখাচ্ছে কি না এবং মোবাইল ডেটা অন করলে ঠিকমতো ইন্টারনেট চলছে কি না তা নিশ্চিত করুন। দুই মিনিটের জন্য হলেও একটি ফোন কল করে দেখুন কথা কেটে কেটে যাচ্ছে নাকি পরিষ্কার শোনা যাচ্ছে।
সিম কার্ডের পাশাপাশি ওয়াই-ফাই (Wi-Fi) এবং ব্লুটুথ (Bluetooth) অন করে চেক করে নিন। ওয়াই-ফাই অন করে আশেপাশের রাউটারগুলো দ্রুত স্ক্যান করে কানেক্ট হচ্ছে কি না দেখে নিন।
ব্লুটুথের মাধ্যমে কোনো এয়ারবাডস বা অন্য ফোনের সাথে সহজে পেয়ার করা যাচ্ছে কি না তা চেক করে দেখে নিন। অনেক সময় ফোন রিমোটলি বা ড্রপ করার কারণে ওয়াই-ফাই ও ব্লুটুথ কার্ডের ক্ষতি হয়,ফলে খুব কাছে না গেলে সিগন্যাল পাওয়া যায় না।
১০.রিয়েল লাইফ ইউজার এক্সপেরিয়েন্স এবং সফটওয়্যার আপডেট
ব্যবহার করা ফোন কেনার সময় শুধু হার্ডওয়্যার দেখলেই চলে না,সেটির সফটওয়্যার সাপোর্ট বা ওএস (OS) কন্ডিশন বিবেচনা করা অত্যন্ত প্রয়োজন। একটি খুব পুরনো ফোন যদি হার্ডওয়্যারে ভালোও থাকে,কিন্তু তার সফটওয়্যার সাপোর্ট যদি বন্ধ হয়ে গিয়ে থাকে, তবে কিছুদিন পর বিভিন্ন দরকারি অ্যাপস তাতে আর চলবে না।
যে মডেলটি কিনছেন সেটি বর্তমানে কোন অ্যানড্রয়েড বা আইওএস ভার্সনে চলছে এবং ভবিষ্যতে আর কোনো অফিসিয়াল আপডেট পাবে কি না তা ইন্টারনেটে দেখে নিন।
যদি ফোনটিতে কোনো থার্ড পার্টি ‘কাস্টম রম’ বা ‘রুটেড’ সফটওয়্যার ইনস্টল করা থাকে, তবে ব্যাংকিং অ্যাপস বা অনলাইন পেমেন্ট অ্যাপগুলো নিরাপত্তা জনিত কারণে কাজ নাও করতে পারে।
বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করুন ফোনটিতে কোনো প্রকার রুট করা আছে কি না বা ড্রাইভার মোড অফ আছে কি না। সেটিংস থেকে ‘Software Update’ অপশনে গিয়ে চেকিং দিয়ে দেখুন কোনো এরর বা কাস্টম রমের নোটিফিকেশন দেখায় কি না। সম্পূর্ণ অফিসিয়াল ও অরিজিনাল সফটওয়্যারে চলা ফোন ব্যবহার করা সবসময় নিরাপদ ও ঝামেলাহীন।
১১. অরিজিনাল এক্সেসরিজ ও বক্স যাচাই
একটি সেকেন্ড হ্যান্ড ফোনের সাথে সেটির অরিজিনাল বক্স,অরিজিনাল পাওয়ার অ্যাডাপ্টার এবং ক্যাবল পাওয়া গেলে সেই ফোনের গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেড়ে যায়। বক্স থাকা মানে ফোনটি চুরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায় চলে আসা।
ফোনের সাথে দেওয়া চার্জিং ডক এবং ক্যাবলটি অরিজিনাল কি না ভালো করে দেখে নিন। আজকাল বাজারে অরিজিনাল চার্জারের হুবহু নকল ফাস্ট চার্জার প্রচুর পাওয়া যায়।
নকল চার্জার ব্যবহার করলে ব্যাটারি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায় এবং মাদারবোর্ডে শর্ট সার্কিট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। চার্জার হালকা নাকি ভারী এবং সেটির ওপর লেখা প্রিন্টিং আঁকাবাঁকা কি না তা লক্ষ্য করলেই আসল-নকল পার্থক্য বোঝা যায়।
যদি বিক্রেতা বক্স বা অরিজিনাল ক্যাবল দিতে না পারেন, তবে ফোনের দাম কিছুটা কমিয়ে দিতে বাধ্য করা যৌক্তিক। কারণ পরবর্তীতে আপনি নিজে যখন আবার ফোনটি বিক্রি করতে যাবেন, তখন বক্স না থাকলে আপনিও ভালো দাম পাবেন না।
১২.লেনদেনের স্থান ও নিরাপত্তার বিষয়সমূহ
সবচেয়ে শেষ কিন্তু সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়টি হলো আপনি বিক্রেতার সাথে কোথায় দেখা করছেন এবং কীভাবে অর্থ লেনদেন করছেন। অনলাইনের অপরিচিত কোনো বিক্রেতার সাথে রাতের বেলা বা কোনো নির্জন গলিতে দেখা করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
যে কোনো সেকেন্ড হ্যান্ড জিনিস কেনার জন্য সবসময় দিনের আলোতে কোনো জনবহুল স্থান,শান্ত ক্যাফে বা সবচেয়ে ভালো হয় কোনো শপিং মল অথবা বিক্রেতার নিজের বাড়ি বা দোকানে গিয়ে লেনদেন করা।
এতে করে আপনি ফোনটি শান্তিমতো ২০-৩০ মিনিট সময় নিয়ে টেস্ট করার পর্যাপ্ত আলো ও পরিবেশ পাবেন। তাড়াহুড়ো করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দুই মিনিটে ফোন কেনা মানেই বড় ধরনের ভুল করে ফেলবেন।
টাকা পরিশোধের ক্ষেত্রে ক্যাশ দেওয়ার চেয়ে ডিজিটাল ব্যাংক ট্রান্সফার বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। এতে আপনার কাছে একটি শক্ত ডিজিটাল লেনদেনের প্রমাণ থেকে যায়। বিক্রেতার নাম, মোবাইল নম্বর এবং এনআইডি কার্ডের ছবির সাথে বিকাশ বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টের নাম মিলিয়ে নেওয়া অতিরিক্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন।
চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কীভাবে নেবেন?
উপরে উল্লেখিত প্রতিটি ধাপ বা টেস্ট যদি ফোনটি সফলভাবে পার করতে পারে, তবেই কেবল সেটি কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। ব্যবহৃত ফোনে দুই-একটি ছোট আঁচড় থাকা খুব স্বাভাবিক বিষয়, তাই সামান্য বাহ্যিক দাগের জন্য ভালো একটি ফোন হাতছাড়া না করাই ভালো।
কিন্তু যদি স্ক্রিন চেঞ্জ, ব্যাটারি ড্রপ, অতিরিক্ত গরম হওয়া কিংবা আইএমইআই নম্বরে কোনো গরমিল চোখে পড়ে, তবে সেই ফোন যত কম দামেই পাওয়া যাক না কেন, এড়িয়ে চলাই সবচেয়ে ভালো হবে।
একটু সময় নিয়ে, নিজের চোখ-কান খোলা রেখে ঠান্ডা মাথায় প্রতিটি পার্টস ও ফিচার যাচাই করে নিলে কম খরচে একটি ব্যবহৃত ফোন থেকেও একদম নতুন ফোনের মতো দারুণ ও দীর্ঘস্থায়ী পারফরম্যান্স আশা করতে পারেন বলে মনে করি।
